• Hobbies and Dreams

দক্ষিণেশ্বর শিব-মন্দির (একটি তথ্যচিত্র)


আমাদের দেশ ভারত এক বৈচিত্রময় দেশ। নানা ভাষা, সংস্কৃতির এই মিলনক্ষেত্রে, আর এক বৈচিত্রময়তা পরিলক্ষিত হয়, সেটা ধর্মের বেলায়। অসংখ্য মন্দির বেষ্টিত এই দেশে হাজারো গল্প-কাহিনী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। শুধু, একটু অনুসন্ধানী চোখ মেলে তাকালেই, আমরা অনেক অজানার আলোকে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারি।

বাড়ির পাশের প্রাচীন মন্দির, দক্ষিণেশ্বর শিব-মন্দির :

41 নং জাতীয় সড়ক, যেটা বিখ্যাত হলদিয়া বন্দরকে (হলদি নদীর তীরে) 6 নং জাতীয় সড়কের (মুম্বাই সড়কের) সাথে যুক্ত করেছে, তার উপর নন্দকুমার' ও খঞ্চি' নামক স্টপেজ দুটোর মধ্যবর্তী হাঁসগেড়্যা নামক বাস-স্টপ থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম বরাবর 1.5 কিলোমিটার দুরে এই মন্দির অবস্থিত।

ইতিহাস কি বলছে:

অনেক প্রাচীন কালের কথা। তখন এখানে প্রবাহিত ছিল এক নদী। বলা হয়, এখান থেকে প্রায় 5 কিলোমিটার দুরে, বর্তমান নরঘাটের'কাছে প্রবাহিত হলদি নদী-ই সেই প্রাচীন নদী। কালের স্রোত তাকে এখন এত দুরে নিয়ে এসে ফেলেছে। এই প্রাচীন দক্ষিণেশ্বর শিব-মন্দিরটি ডিহি-গুমাই নামক গ্রামে অবস্থিত। এর দক্ষিণে বিদ্যাধরপুর, দক্ষিণ-গুমাই, কল্যানচক, ভবানীপুর, শ্যাম-সুন্দরপুর, ইত্যাদি গ্রামগুলো সব ছিল ঐ তৎকালীন প্রবাহিতা তটিনীর প্রবাহ-রেখান্তর্গত। একটা আস্ত নদীর এত দুরে সরে যাওয়ার সময়টা একটা প্রাচীনত্বেরআন্দাজ দেয়।

গল্পের ভেতরের গল্প :

উপরে বর্ণিত ঐ তৎকালীন নদীর উল্টোদিকে তখন বাস করত এক অত্যন্ত দরিদ্র ও সৎ সরল সাদাসিধে রাখাল ছেলে। ধনী-গৃহে রাখালের কাজে বহাল। অকারণে অনেক অত্যাচারসইতে হত তাকে, মনিবের কাছে। তার সাথে ছিল দুধ চুরি করে খেয়ে নেওয়ার মিথ্যা অপবাদ।

রাখাল ছিল সৎ। তারমনে হল, হয়তো অন্য কেউ তার অগোচরে এই অপকর্মটি করে যাচ্ছে। যার খেসারৎ স্বরূপ নিত্য প্রহার ও লাঞ্ছনার যন্ত্রণা বইতে হচ্ছে তাকেই। কাজেই, চোরকে হাতেনাতে ধরার জন্য সে অনেক প্রয়াস করল। কিন্তু, কাউকেই সে বমাল ধরতে অসমর্থ হল।

অবশেষে, সে গরুগুলোকে একটু আলাদা মনোযোগ দিয়ে, দুর থেকে লক্ষ করতে লাগল। সে আবিস্কার করল, দুগ্ধবতী গাভীগুলো নদী পেরিয়ে এই দিকে চলে আসছে। সে বেশ আশ্চর্য হল। পরের দিনই, সে রইল তক্কে তক্কে। যেই না দুগ্ধবতী গাভীগুলোকে নদী পেরোতে দেখল, অমনি, সেও পিছু নিয়ে সাঁতরে এদিকে চলে এল, নিজেকে যথাসম্ভব আড়াল রেখে।

হোগলা'র জঙ্গলে ঢাকা একটা বিশেষ জায়গায়, সে দেখল, দুধেল গাভীগুলো সব একজনের পরে আর একজন - এভাবে যথাক্রমে সারি দিয়ে দাঁড়াচ্ছে। যেন, মন্ত্রমুগ্ধের মতো। আর, আশ্চর্য্যের বিষয়, সে দেখল, সমস্ত দুধ আপনা-আপনি বেরিয়ে পড়ে যাচ্ছে। যে কারণে সে অনাহার আর নির্যাতনের শিকার, চাক্ষুস দেখে, সে বিস্মিত ও ক্রুদ্ধ হল খুব।পরদিন, টাঙ্গী' নিয়ে সে হোগলার বন ছাঁটতে শুরু করে। ছাঁটতে ছাঁটতে সেই বিশেষ জায়গায় এসে, তার অস্ত্র কঠিন কিছু এক বস্তুতে আঘাত হানে। দেখা যায়, সেটি কালো রঙের এক প্রস্তর-খণ্ড। রাখালের ঐ আঘাতে সেটা কেটে যায়। ঐ কর্তিত প্রস্তর-খণ্ডই দক্ষিণেশ্বর শিবের বিখ্যাত জ্যোতির্লিঙ্গ।

পূজোর শুরু হয়। এরপর, ছড়িয়ে পড়ে কাহিনী। খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে ঠাকুরের। অনেকদিনের পরে, ঐতিহাসিক যুগে এসে, মহিষাদলের গর্গ রাজ-পরিবার এই মন্দিরটি সংস্কার করেন। মন্দিরের পরিচিতির গণ্ডি আরও ব্যাপ্ত হয়।

পূজো ও বাৎসরিক অনুষ্ঠান :

এই মন্দিরে নিত্যপূজা হয়। পুরোহিত নিযুক্ত আছেন। পাণ্ডারাজের মতো অপ-সংস্কৃতি এখানে আজও নেই। প্রতিবছর নীলের আগের দিন এখানে রাজ-পরিবারের তরফ থেকে পুজো নিবেদন হয়ে গেলে, অপেক্ষমান ভক্ত সাধারণের জন্য দুধ ও ডাবের জল ঢালা (শিবলিঙ্গের মাথায়)শুরু হয় রাত তিনটে থেকে। অসংখ্য ভক্তের সমাগম হয় বার্ষিক এই অনুষ্ঠানে। ভক্ত সাধারণের জন্য দুধ ও ডাবের জল ঢালার ব্যপারটা মিটে গেলে, ব্রাহ্মণগণ শিবলিঙ্গের মাথায় 108 কলসি জল ঢালেন, সংলগ্ন পুকুর থেকে।

নীলের পরের দিন চড়ক। মন্দিরের পুকুরে বিগত বছর থেকে নিমজ্জিত থাকা আদি চড়ক-গাছ তুলে, জাগ্রত করে, ফাঁকা কোনও জায়গায় ভূমিতে প্রোথিত করে যথাবিহিত উপকরণ সহযোগে অভিষেকের মাধ্যমে পুজো সম্পন্ন হয়। এইদিন, চড়কপর্বের আগে পর্যন্ত ঠাকুরের রাাখাল বেশ থাকে। চড়ক-পর্ব মিটে গেলে, অপরূপ রাজবেশে বিরাজ করেন ঠাকুর।

বিশ্বাস

এটা এখানে মানা হয় যে, চড়ক অনুষ্ঠান চলাকালীন ঘুর্ণায়মান চড়ক থেকে ঠাকুরের যে প্রসাদী পাকা বিচেকলা ছুঁড়ে দেওয়া হয়, সেটা খেলে, নিঃসন্তান দম্পতিও সন্তান প্রাপ্ত হতে পারেন।

ইতিহাসের সংযোগ (পৌরানিক ইতিবৃত্ত) :

ভাগবত পুরাণ, মহাভারত, বিষ্ণুপুরাণ ইত্যাদিতে সমুদ্রমন্থনের উল্লেখ আছে। সেই সুদুর পুরাকালে, বাসুকী-নাগকে রজ্জু বানিয়ে, মন্দার পর্বতকে দণ্ড হিসেবে ব্যবহার করে দেবকুল ও অপরদিকে অসুরকুল মিলে সমুদ্রমন্থনকালে বাসুকীনাগের মুখনিঃসৃত তীব্র কটুবিষ হলাহলকে কণ্ঠ্যে ধারণের পর, দেবাদিদেব নীলকণ্ঠ্য হয়ে ভীষণ যন্ত্রনায় কাতর হয়েছিলেন। সেই পুণ্যস্মৃতিতে, ভক্তগণ বাৎসরিক এই অনুষ্ঠানে তাঁর মস্তকে দুধ, ডাবের জল ঢেলে, তাঁর যন্ত্রনা উপশমের প্রয়াস করেন ও সেইসঙ্গে, সৃষ্টি রক্ষার্থে তাঁর এই মহান ত্রাতার ভূমিকাকে সম্মান প্রদর্শন করেন।

ভিডিও দেখুন:

#Daksineswar #DakshineswarShibMandir #ShibMandir #PurbaMedinipur

© 2027 By Hobbies and Dreams Proudly created by Hobbies and Dreams

  • Twitter Social Icon
  • Pinterest Social Icon
  • Instagram Social Icon
  • Facebook Social Icon
  • YouTube Social  Icon