• Hobbies and Dreams

শ্রী শ্রী গোপাল জীউ-এর মন্দির ও তিরুমীর ডাকাতের কথা (মহিষাদল রাজবাড়ি)


সময়ের অনন্ত প্রবাহ-ধারায় কতোই না আঁকিবুকি খেলা চলে রোজ। তারই কিছুকিছু রেখা সময়ের প্রেক্ষাপটকে ছাপিয়ে হাত ধরাধরি করে এসে সামনে দাঁড়ায় একদিন। তখন, আমরা তাকে বলি- ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখা। মনের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পড়ে সমীহের রেশ। আসলে, ইতিহাসকে ফিরে দেখতে হলে, খুব যে বিশ্লেষকের দৃষ্টি নিয়ে দেখার আবশ্যকতা আছে, এমন নয়। একটু ঐতিহ্য-প্রীতি, একটু গর্ববোধ- এটুকুই যথেষ্ট।

আজ, আমরা প্রাচীন ঐতিহ্যমন্ডিত মহিষাদল রাজবাড়ির শ্রী শ্রী গোপাল জীউ-এর মন্দির ও তৎসম্পর্কিত দুটো গল্পকথা কালের গর্ভ থেকে তুলে এনে, নতুন করে শুনে নেব।

অনেকদিন আগের কথা। তখন ইংরেজ জমানা চলছে, অখণ্ড ভারতবর্ষের বুকে। মহিষাদলের গর্গ-রাজপরিবার তখন তাঁদের শিল্পকলাসহ বিভন্ন ক্ষেত্রে সমুজ্জল। নিয়মিত আসর বসে বিভন্ন সঙ্গীত-ঘরানার দিকপালদের নিয়ে। প্রসঙ্গতঃ কেসরী বাঈ, ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলি, সানাই-সম্রাট বিসমিল্লা খান'রাও এককালে এইসব আসরে অভ্যাগতদের মধ্যে থাকতেন। যাইহোক, রাজা'রা রাজপরিবার কিন্তু শুধুই সুর জলসা আর বিলাসে গা' ভাসিয়ে দেওয়া লোক ছিলেন না। বিভিন্ন জনহিতকর কাজ ও সেইসঙ্গে মন্দির নির্মান ও সংস্কারের মতো বিষয়ের তাঁদের নাম উঠে আসত - নানা সময়ে।

তো, তাঁদের সেই সমৃদ্ধির দিনগুলোতে তাঁরা পরিবারের প্রতিষ্ঠিত পারিবারিক বিগ্রহ দেবতা শ্রী শ্রী গোপালজীউ এর মন্দিরের উচ্চ-চূড়ায় একটা বড় সোনার ঘণ্টা বাঁধলেন। তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নিদর্শন হিসাবে।

সবই ঠিক ছিল, কিন্তু সমস্যা হ'ল, একটা ছোট্ট গুঞ্জনকে কেন্দ্র করে। গুঞ্জনটা আর কিছুই নয়, রাজ-কর্মচারিদের মধে্য একটা ভীতির সঞ্চার হয়েছে, এই উচ্চমূলে্যর স্বর্ণনির্মিত ঘণ্টার নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে। অল্পদিনের মধ্যেই, সেই গুঞ্জন পৌঁছালো রাজ-সিংহাসন পরযন্ত।

রাজা জানতে চাইলেন, এত আতঙ্কের হেতুটা কি? এতোবড় নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন - রাজপ্রাসাদের সমস্ত দিকে, তার ওপর, সবার বাইরে গভীর পরিখা দিয়ে ঘেরা এই রাজপ্রাসাদ ও শ্রীশ্রী গোপাল জীউ-এর মন্দির সংলগ্ন অঞ্চল। তাহলে, এই দ্বিগুণ সুরক্ষার বলয়ে স্বর্ণনির্মিত একটা ঘণ্টার নিরাপত্তাকে নিয়ে এমন অমূলক আতঙ্কের কোনও হেতু আছে কি? তখন, রাজ-কর্মচারিগণ জানালেন - তৎকালীন স্থানীয় ত্রাস "ডাকাত তিরুমীরের" কথা। রাজা কথাটা শুনেই ফুৎকারেই উড়িয়ে দিলেন। বললেন, "তিরুমীর'? দেখতে হবে কেমন সে তিরুমীর! চারদিকে দামামা বাজিয়ে ঘোষণা করে দেওয়া হোক; যে, মহিষাদল রাজপরিবারের পারিবারিক দেবতা শ্রী শ্রী গোপাল জীউ-এর মন্দিরের উচ্চচূড়ায় বিশাল এক স্বর্ণনির্মিত ঘণ্টা টাঙ্গানো হয়েছে। কেউ যদি আগামী তিন দিনের মধ্যে সেটি চুরি করতে পারে, তাহলে সোনার ঘণ্টাতো তারই - সেইসঙ্গে উপযুক্ত পুরস্কারও তাকে দেওয়া হবে - রাজ পরিবারের পক্ষ থেকে।" তা-ই করা হ'ল। দিকে দিকে ঢাঁঢরা পিটিয়ে রাজ-ঘোষণা শুনিয়ে দেওয়া হ'ল, জনসাধারণকে।

সেই ঘোষণা স্বনামধন্য তিরুমীর ডাকাতের কানেও পৌঁছালো - এটা বলা বাহুল্যমাত্র। প্রথম রাত কাটল খুবই উদ্বেগের সাথে ও চরম সতর্কতার সঙ্গে - রাজকর্মচারিদের। আসলে, এমনিতেই নিশ্ছিদ্র পাহারাই তারা দেয় সবসময়। এই ঘোষনার পর তাতে আরও নিষ্ঠার ও আত্মসম্মানের প্রশ্ন যোগ হয়ে যাওয়ায়, সবাই আরও তৎপর হয়ে ওঠার চেষ্টায়।

রাজপরিবারের এই প্রাসাদ, নহবৎখানা, কাছারি দূর্গামণ্ডপ ও শ্রীশ্রী গোপালজীউ এর মন্দিরকে বেষ্টন করে সীমানা বরাবর আছে পরিখা বা গড়। সেটা পেরোতে পারলেও পরপর দুটো বড়মাপের দীঘি। দুই দীঘির মাঝে আমবাগান ও সদাব্যস্ত রাস্তা। অতএব, প্রথম রাতে কোনও অঘটন না ঘটায় রাজকর্মচারিগণ কিঞ্চিৎ আশ্বস্ত। যে, এতবড় দুঃসাহসের ঝুঁকি তিরুমীর বোধহয় নিতে পারল না। তাছাড়া, বয়সওতো হয়েছে!

এদিকে, সদাব্যস্ত রাজপরিবারে অহরহ জনসমারোহ। ঘণ্টায় ঘণ্টায় সেখানে বেল বাজায় চৌকিদার - প্রহর ঘোষণার জন্য। যখন যটা বাজে, ততগুলো বাড়ি পড়ে, ঘণ্টায়। এটাই নিয়ম।

প্রথমরাতে যে কোনওকিছুই ঘটেনি, একটাই কারণ, স্বনামধন্য ডাকাত প্রথম দিন ও রাতে - পরিখার বাইরে যে সাধারণের জন্য রাস্তা, সেখান থেকে শ্যেন-দৃষ্টিতে নজর রেখেছে ভেতরের গতিবিধির উপরে।

দ্বিতীয় দিনে, রাত নামতেই, "অপারেশন স্বর্ণঘণ্টা"র শুরু। সঙ্গী বলতে তার বড় একটা দড়ি, কয়েকটা বড় সাইজের পেরেক (যেগুলো মাটির ঘর বানাতে বাঁশ ও কাঠের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়) আর, বড় সাইজের পেল্লায় এক হাতুড়ি।

রাত বাড়তেই, যখন ভেতরে লোকজনের সংখ্যা একটু কমতির দিকে, তারই মাঝে সুযোগসন্ধানী কখন গড়ের কচুরিপানার আড়াল নিয়ে ডুব-সাঁতারে আমবাগানে। আবার, ফাঁক বুঝে, মন্দির সংলগ্ন জঙ্গলের মধ্যে। ঐযে, প্রহরে প্রহরে ঘণ্টাধ্বনি হয়, তারই অনুষঙ্গে এবং আড়ালে এক এক হাতুড়ির ঘায়ে এক একটা পেরেক ঢুকিয়ে, আবার পরের প্রহরের ঘণ্টা-ধ্বনির জন্য অপেক্ষা। এইভাবেই, একসময়ে, মন্দির-চূড়ায়- ঐ পেরেকগুলিতে ভর করে। তারপর, প্রলুব্ধিত স্বর্ণঘণ্টা স্বনামখ্যাত তিরুমীর ডাকাতের করায়ত্ব। এটা কিন্তু শুধুই গল্পকথা নয়।

কেমনতর এই তিরুমীর? শোনা যায়, তিনি ছিলেন খুবই দীর্ঘ-দেহী, বলিষ্ঠ এবং চতুরবুদ্ধি সম্পন্ন। এটাও শোনা যায়, গরীবের সর্বস্ব হরণের গ্লানি স্পর্শ করেনি এই ডাকাতের দীর্ঘ জীবনে।

সন্নিকটস্থ এলাকাবর্তী মানসিক রোগীদের প্রখ্যাত চিকিৎসক প্রয়াত এনাঙ্কশেখর মাইতি মহাশয়ের জীবনের একটা ঘটনা। তিনি তখন সদ্যসদ্য ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছেন। মায়ের কাছে অনুমতি নিয়ে পাড়ার কিছু লোকের সঙ্গে যাত্রাপালা - যেটা ছিল তৎকালীন একটা বিনোদন; দেখতে গেছেন বাড়ি থেকে অনেকটাই দুরে। স্বাভাবিকভাবেই, কিছুক্ষণ পর থেকেই তাঁর অনভ্যস্ত মনে যাত্রাপালা একঘেঁয়েমি ও বিরক্তকর ঠেকায়, তিনি শুকনো ধান জমির আল ধরে বাড়ি ফিরতে শুরু করেন। একা একাই। কিছুদুর যাওয়ার পর-ই, তিনি লক্ষ্য করেন, আবছায়া জ্যোৎস্না চিরে পেছন দিক থেকে বেশ দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে এক দীর্ঘ মুর্তি। পলক ফেলার আগেই যেন, সে মুর্তি কাছে এসে হাজির। মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে, "কি? মাইতি বাবু যে? এতটা পথ এরকম করে চললে যে, রাত কাবার হয়ে যাবে! নিন্ উঠে পড়ুন!" উনি বললেন, "আপনার পিঠে এতবড় বোঝা, আমি কি করে সেটা আরও বাড়াই?"

"আরে, নিন্ নিন্, উঠে পড়ুন", বলেই প্রায় জোর করে তুলে নিলেন, পিঠে। তারপর, একঘণ্টার রাস্তাকে কয়েক মিনিটে পার করেই, "মাইতি বাবু, ঘুমিয়ে পড়লেন নাকি? এসে গেছি! নেমে পড়ুন।"

এতো গেলো, তিরুমীর ডাকাতের কথা।

এবার, শুরু করা যাক, আসল লোকের কথা। কষ্টিপাথরের বিগ্রহ-মুর্তিতে শ্রীকৃষ্ণের একটি রূপ এই শ্রী শ্রী গোপাল জীউ। এই মন্দিরে এলেই, এক সুন্দর অনুভব হয়। সঙ্গে যোগ হয়েছে, ঐতিহাসিক পরিমণ্ডলের আবহ। এখন, এখানে ৬০ টাকা দিলে কোনও ব্যাক্তি গোপাল জীউ-এর ভোগ-প্রসাদ পেতে পারেন। শুধু তাই নয়, মনে করলে, ব্যাক্তগত ভাবে নিজের পছন্দের মেনু সহযোগে তাঁকে ভোগ নিবেদন ও প্রসাদ গ্রহণের বন্দোবস্ত করতে পারেন। বর্তমানে, বিবাহ, অন্নপ্রাশনের মতো অনুষ্ঠান গুলোও এই মন্দিরে এসে সম্পন্ন করে নেওয়া যায়।

বার্ষিক রথযাত্রার সময়ে, গোপালজীউ রথে চড়ে, গুণ্ডিচা-বাটি'তে মাসীর বাড়ি যান। ফেরেন, ফেরেৎ রথযাত্রায়। দুরদুরান্ত ও আসপাশ থেকে অসংখ্য মানুষ এসে ভিড় করেন সেই মহা-সমারোহের দিনগুলোতে।

বেশ বড়মাপের মেলা বসে, পুরো মহিষাদল শহরটাকে জুড়ে। এই মেলায় অন্যান্য সমস্ত রকম পণ্যের সঙ্গে প্রচুর গাছের চারা, পাখি ও পোষ্যের পশরা বসে।

শ্রী শ্রী গোপাল জীউকে কেন্দ্র করে, মানুষজনের মনে অসীম আনন্দের সঞ্চার হয়।।

********************************************************

#GopalJiu #Mahishadal #Rajbari #Tirumir

© 2027 By Hobbies and Dreams Proudly created by Hobbies and Dreams

  • Twitter Social Icon
  • Pinterest Social Icon
  • Instagram Social Icon
  • Facebook Social Icon
  • YouTube Social  Icon