থানকুনি : অত্যাশ্চর্য্য এক ভেষজ ভাণ্ডার

থানকুনির বিজ্ঞানসম্মত নাম: Centella asiatica । পশ্চিমবঙ্গেই শুধু নয়, সমগ্র ভারতবর্ষেই এটি একটি অত্যন্ত পরিচিত অপরিহার্য্যরূপে জনপ্রিয় ভেষজ। বিভিন্ন রোগ থেকে চিরমুক্তির এক অনবদ্য উপকরন। বাংলাদেশে এর স্থানীয় নাম (ডোলমাণিক) , সংস্কৃতে : मधुकपर्णी নামে অভিহিত করা হয়। এই থানকুনি এক ধরননের খুব ছোটছোট বর্ষজীবি ভেষজ উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক পরিবারের নাম ম্যাকিনলেয়াসি’; যাকে অনেকে এপিকেসি পরিবারের উপ-পরিবার বলে মনে করেন। ভেষজ হিসেবে এর বহুল ব্যবহার রয়েছে।



ভারতীয় আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে, প্রাচীণ আফ্রিকীয় ও চৈনিকসহ অন্যান্য অনেক দেশের চিকিৎসা বিদ্যায় এই মহা উপকারী ভেষজ-এর উল্লেখ রয়েছে। বৈজ্ঞানিক নাম আগে ছিল Hydrocotyle asiatica L এবং Trisanthus cochinchinensis (Lour.)।


পরিচিতি:

অঞ্চলভেদে থানকুনি পাতাকে আদামনি, তিতুরা, টেয়া, মানকি, থানকুনি, আদাগুনগুনি, ঢোলামানি, থুলকুড়ি, মানামানি, ধূলাবেগুন থালকুড় ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। তবে, বর্তমানে থানকুনি বললে, সবাই সহজেই চেনেন।


গুণাগুণ:

১) এতে আছে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি। আর, সকলেইজানেন, ভিটামিন সি রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা


বাড়ায়| অর্থাৎ, থানকুনি ভক্ষণে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতার বৃদ্ধি হয়।

২) মুখের ব্রণ দুর করে।


(৩) আমাশয়ে ভালো কাজ করে। পেট পরিস্কার করে। কাজেই, থানকুনি ব্রণ দূরীকরণের মাধ্যমে মুখের শ্রী বৃদ্ধি করে; এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যপার।

৪) মুখের ঘা I শরীরের অন্যান্য ক্ষতের উপশমে খুবই উপকারীর ভূমিকা নেয়|

৫) সর্দির জন্যও উপকারী।

৬) পেটের অন্যান্য যেকোনও অসুখেও থানকুনির স্বার্থক ব্যবহার হয়|

৭) সাময়িকভাবে কাশি কমাতে সাহায্য করে এই সহজলভ্য ভেষজ।|

৮) গলাব্যথার উপশমের জন্যও উপকারি।


বিস্তৃতি

ভারত, বাংলাদেশ, সিংহল বা শ্রীলঙ্কা, উত্তর অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, পাপুয়া, নিউ গিনি এবং এশিয়ার অন্যান্য বিভিন্ন প্রান্তেও এই ভেষজ উদ্ভিদটি পাওয়া যায়।



রসায়ন

সেন্টেললায় এশিয়াটিকোসাইড, ব্রাহ্মোসাইড, অ্যাসিয়্যাটিক অ্যাসিড এবং ব্রাহ্মিক এ্যাসিড ( ম্যাডাস্যাসিক এ্যাসিড) সহ পেন্টাসাইক্লিক ট্রাইটারপেনয়েড রয়েছে। অন্যান্য উপাদানগুলির মধ্যে রয়েছে সেন্টিলোজ, সেন্টেলোসাইড এবং ম্যাডেক্যাসোসাইড।

থানকুনি আসলে আমাদের দেশের খুবই পরিচিত একটি ভেষজ গুণসম্পন্ন উদ্ভিদ। এর ল্যাটিন নাম centella aciatica... গ্রামাঞ্চলে থানকুনি পাতার ব্যবহার আদিকাল থেকেই হয়ে আসছে। ছোট্ট, প্রায় গোলাকৃতি এই পাতার মধ্যে রয়েছে ওষধি সমস্ত গুণাগুণ। থানকুনি পাতার রস রোগ নিরাময়ে অতুলনীয়। প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে বহু রোগের উপশম হয় এর ভেষজ গুণ থেকে। খাদ্য হিসেবে সরাসরি গ্রহণে থানকুনি বিভিন্ন রোগের নিরাময়ে যথার্থ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

অঞ্চলভেদে থানকুনি পাতাকে আদামনি, তিতুরা, টেয়া, মানকি, থানকুনি, আদাগুনগুনি, ঢোলামানি, থুলকুড়ি, মানামানি, ধূলাবেগুন থালকুড় ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। তবে, বর্তমানে থানকুনি বললে, সবাই সহজেই চেনেন।



একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে কেউ যদি নিয়মিত থানকুনি পাতা খাওয়া শুরু করেন, তাহ'লে মাথার চুল থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত শরীরের প্রতিটি অংশের কর্মক্ষমতা বাড়তে শুরু করে। সেইসঙ্গে মেলে আরও অনেক উপকার। যেমন, ধরাযাক...........

১) চুল পড়ার হার কমে: নানা সময়ে হওয়া বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে সপ্তাহে ২-৩ বার থানকুনি পাতা খেলে স্কাল্পের ভেতরে পুষ্টির ঘাটতি দুর হয়। ফলে, চুল পড়ার মাত্রা কমতে শুরু করে। চুল পড়ার হার কমাতে আর একভাবেও থানকুনি পাতাকে কাজে লাগানো যায়। কিভাবে? পরিমান মতো থানকুনি পাতা নিয়ে তা থেতো করে নিতে হবে। তারপর, তার সঙ্গে পরিমান মতো তুলসী পাতা এবং আমলা মিশিয়ে একটা পেষ্ট বানিয়ে নিতে হবে। সবশেষে, পেষ্টটা চুলে লাগিয়ে নিয়ে, কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। মিনিট দশেক পরে ভালো করে চুলটা ধুয়ে নিতে হবে। প্রসঙ্গতঃ সপ্তাহে কম করে ২ বার এইভাবে চুলের পরিচর্যায় উল্লেখযোগ্য ও ফলপ্রসু পরিবরতন দেখা যাবে।


২) টক্সিক উপাদানগুলো শরীর থেকে বেরিয়ে যায়: নানভাবেই সারাদিন ধরে একাধিক ক্ষতিকর টক্সিন আমাদের শরীরে, রক্তে প্রবেশ করে। সময় থাকতে এইসব বিষাক্ত পদার্থগুলো যদি শরীর থেকে বের করে দেওয়া না যায়, তাহ'লে বিষম বিপদ! আর এই কাজটি থানকুনি পাতা খুব ভালোভাবেই করে। কিভাবে? এক্ষেত্রে, প্রতিদিন সকালে অল্প পরিমান থানকুনি পাতার রসের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে, রক্তে উপস্থিত ক্ষতিকর উপাদানগুলি বেরিয়ে যায়। ফলে, একাধিক রোগ দুরে থাকতে বাধ্য হয়।

৩) ক্ষতের চিকিৎসা করে: থানকুনি পাতায় উপস্থিত স্পেয়োনিন্স এবং অন্যান্য উপকারি উপাদানের জন্য এক্ষেত্রে শরীরে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। শরীরে কোথাও কেটে গেলে, বা, ক্ষত সৃষ্টি হ;লে সঙ্গে সঙ্গে অল্প থানকুনি পাতা বেটে লাগালে, উপকার পাওয়া যায়।



৪) হজম ক্ষমতার উন্নতি করে: থানকুনি পাতায় হজম ক্ষমতার উন্নতি হয়। বেশকিছু গবেষণায় জানা গেছে, থানকুনি পাতায় উপস্থিত কতকগুলো বিশেষ উপকারি উপাদান হজমে সহায়ক এ্যাসিডের ক্ষরণে সহায়তা করে। তাই, বদহজম ও গ্যাস-অম্বলের মতো সমস্যা মাথাচাড়া দিতে পারেনা।

৫) ত্বকের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি পায়: থানকুনি পাতায় উপস্থিত এ্যামাইনো এ্যাসিড , বিটা ক্যারোটিন, ফ্যাটি এ্যাসিড এবং ফাইটো-কেমিকেল বা ফাইটো-নিউট্রেন্ট ত্বকের মধ্যে পুষ্টির ঘাটতি দুর করে। ফলে, বলিরেখা ও অন্যান্য দাগ-ছোপ দুর হয়। স্বাভাবিকভাবেই, ত্বকের ঊজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়। সেইসঙ্গে কম বয়সে ত্বকের বুড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কমে।

৬) আমাশয় দূর করে: প্রতিদিন সকালে, খালি পেটে নিয়ম করে থানকুনি পাতা খেলে, ৭ দিনেই ফল পাওয়া যায়। আর এক পদ্ধতিতেও এই উপকার পাওয়া যেতে পারে; থানকুনি পাতা বেটে নিয়ে, তার রসের সাথে অল্প চিনি মিশিয়ে মিশ্রণটি দিনে দু'বার দু'চামচ ক'রে খেলেই উপশম হয়।


৭) পেটের রোগের চিকিৎসায় : অল্প পরিমান আম গাছের ছালের সঙ্গে ১টি আনারসের পাতা , কাঁচা হলুদের রস এবং পরিমানমতো থানকুনি পাতা ভালো করে বেটে, মিশিয়ে নিয়ে মিশ্রণটি নিয়মিত খেলে, অল্প দিনেই যে কোনও ধরনের পেটের অসুখ সেরে যায়। সেইসঙ্গে, ক্রিমিরও প্রকোপ কমে।

৮) কাশির প্রকোপ কমে: ২ চামচ থানকুনি পাতার রসের সাথে অল্প চিনি মিশিয়ে খেলে, সঙ্গেসঙ্গে কাশি কমে যায়। এক সপ্তাহ খেতে পারলেতো, চিরতরে কাশি'ই বিদায় নেবে!


৯) জ্বরের প্রকোপ কমে: ঋতু-পরিবর্তনের সময়ে, সহজেই যাঁরা জ্বরের ধাক্কায় কাবু হয়ে পড়েন, তাঁদেরতো থানকুনি পাতা খাওয়া অবশ্য-কর্তব্য। আয়ুর্বেদশাস্ত্র বলে, যে, জ্বরের সময় ১ চামচ থানকুনি ও ১ চামচ শিউলি পাতার রস মিশিয়ে খালি পেটে খেলে, অল্প সময়েই জ্বর সেরে যায়। সেইসঙ্গে, শারীরিক দুর্বলতাও কমে।

১০) গ্যাস্ট্রিক সমস্যা দূর করে: অসময়ে খেয়ে, অনেকেই গ্যাস্ট্রিক সমস্যাজালে জড়িয়ে পড়েন। এক্ষেত্রে, ০.৫ লিটার দুধে ২৫০ গ্রাম মিছরি এবং অল্প পরিমান থানকুনি পাতার রস মিশিয়ে একটা মিশ্রণ বানিয়ে নিয়ে, সেই মিশ্রণটি অল্প অল্প করে প্রতিদিন সকালে খেলে, এক সপ্তাহেই উপকার মেলে।

১১) বাকস্ফুরনে: বাচ্চারা দেরিতে কথা বললে, বা, অস্পষ্ট কথা বললে, ১ চামচ থানকুনি পাতার রস গরম করে, পরে ঠাণ্ডা হ'লে, ২০/২৫ ফোঁটা মধু মিশিয়ে ঠাণ্ডা দুধের সাথে খাওয়ালে, কিছুদিনের মধ্যেই অসুবিধাটা সেরে যায়।



Recent Posts
Archive
Search By Tags
Follow Us
  • Facebook Basic Square
  • Twitter Basic Square
  • Google+ Basic Square

© 2027 By Hobbies and Dreams Proudly created by Hobbies and Dreams

  • Twitter Social Icon
  • Pinterest Social Icon
  • Instagram Social Icon
  • Facebook Social Icon
  • YouTube Social  Icon
© Copyright