(adsbygoogle=window.adsbygoogle ।।{}).push({ google_ad_client:"ca-pub-2524552414847157", enable_page_level_ads: true }) (adsbygoogle=window.adsbygoogle ।।{}).push({ google_ad_client:"ca-pub-2524552414847157", enable_page_level_ads: true })
 

তাম্রলিপ্ত শহর ও বর্গভীমা মন্দিরের ইতিকথা


পূর্ব-মেদিনীপুরের তমলুক শহর; এটিঐতিহাসিক যুগে তাম্রলিপ্ত নামে পরিচিত ছিল। অনেকরকম ঐতিহাসিক ঘটনা ছুঁয়ে আছে - এই শহরটাকে ঘিরে। বলা হয়, মনসার নির্দেশে বাসরঘরে প্রাণ-হারানো লখীন্দরকে কলার গাছের ভেলায় নিয়ে বেহুলা ভেসে ভেসে প্রাচীন এই বন্দরে এসেছিলেন। এখানেই শেষ নয়! দক্ষ-গৃহে পতি শিবের নিন্দা শুনে, অপমানিত, ক্রোধিত মা' সতী দেহত্যাগ করার পর, তাঁর পুণ্য-দেহকে কাঁধে তুলে - যখন দেবাদিদেব শিব ক্রোধানলে ফুঁসতে ফুঁসতে তাণ্ডবনৃত্য শুরু করেন; তখন, সৃষ্টি-চরাচর ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়। সেই সংকট-মুহুর্তে ভগবান বিষ্ণু তাঁর সুদর্শণ চক্র নিয়ে মা'সতীর পুণ্য-দেহকে খণ্ডিত করার চেষ্টা করেন। নিজেকে আড়ালে রেখে। কারণ, ধ্বংসোন্মুখ, ভীষণ ক্রোধানলে ফুটতে থাকা শিবের সামনে এসে সৃষ্টিকে বাঁচানোর বিষয়ে বাক্য বিনিময় করার ব্যপারটা তখন দুরুহ। কাজেই, তাঁর সেই রূদ্ররূপের কারণস্বরূপ সতী-মায়ের দেহটিকেই বিলুপ্ত করে তাঁকে শান্ত করার প্রয়াস করেন, ভগবান বিষ্ণু। তাঁর সুদর্শণ চক্রের আঘাতে সতীমায়ের পুণ্য-দেহ খণ্ডিত-বিখণ্ডিত হয়ে ৫১টি বিভিন্ন স্থানে গিয়ে পড়ে এবং ৫১ টি পীঠের উদ্ভব হয়। বলা'ই বাহুল্য, শক্তি-পীঠ। তমলুক তথা তাম্রলিপ্তে এসে পড়ে সতী-মায়ের বাম পায়ের গোড়ালি বা বাম গুল্ফ' অংশটি। পড়ে, এখানে সৃষ্টি হওয়া পীঠের পোষাকী নাম "বিভাষ"। এখানে দেবী' মা ভীমরূপা'; "বর্গভীমা" নামেই যাঁর মূলতঃ পরিচয়। তাঁর ভৈরব রূপে এখানে আছেন - ভূতনাথ ওরফে, ভূতিনাথ।

এই মন্দিরকে ঘিরে অসংখ্য জনশ্রুতি ও কিংবদন্তী গল্প প্রচলিত আছে। সবগুলোই খুবই মনোগ্রাহী, চিত্তাকর্ষক। সত্যি বলতে, কোনওটাই একে অপরকে হেয় তো করেই না, - বরং, কালের সূত্রে গেঁথে এক পরিপূর্ণ মালার মতো উস্থাপন করে। আরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে শ্রদ্ধার আবহ জেগে ওঠে তাতে।

প্রায় ৪ হাজারের কাছাকাছি প্রাচীণ মন্দিরের অবস্থান রয়েছে পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর মিলে। তার অধিকাংশই কালের আবর্তনে ভগ্নস্তূপে পর্যবসিত। কিন্তু, সেই মহা-ক্ষয়িষ্ণু সময়কে সগর্বে অগ্রাহ্য করে আজও স্বমহিমায় অটুট তমলুকের এই বিখ্যাত বর্গভীমা মায়ের মন্দির।

পৌরানিক সময়ের স্পর্শে ধন্য এই মন্দির সমস্ত কিংবদন্তী ও ইতিহাস ছুঁয়ে আজও বর্তমান। শক্তি-পূজায় মায়ের যে করালবদনা', ঘোরদংষ্ট্রা' রূপের কথা ওঠে, সে সবকে ছাপিয়ে এখানে মা অনেক বেশী বরাভয়-দায়িনী, আদ্যাশক্তি মহামায়া। স্নিগ্ধরূপিনী মা'।

পুরানে এই তৎকালীন তাম্রলিপ্ত বন্দরের উল্লেখ পাওয়া যায়। ভীষণ ক্রোধানলে দেবাদিদেব শিব ব্রহ্মার পুত্র দক্ষ-প্রজাপতিকে নিহত করে যখন ব্রহ্মহত্যার ফলস্বরূপ, শরীর বিচ্ছিন্ন দক্ষের মাথাকে হাত থেকে আলাদা করতে অসমর্থ হন, - অনেক চেষ্টার পরেও; স্মরণাপন্ন হন ভগবান বিষ্ণুর। শেষে, ভগবান বিষ্ণুর পরামর্শক্রমে, তিনি তাম্রলিপ্তের এই 'বিভাষ' নামক পীঠে গমনপূর্বক তাঁর সেই দুর্গতি থেকে মুক্তি লাভে সমর্থ হন।।।

এই মহাপীঠস্থান বিভাষে'র বর্ণনা প্রসঙ্গে ভগবান বিষ্ণু বলেন,-

"অহংতে কথয়িষ্যামি যত্র নশ্যতি পাতকং

তত্র গত্বা ক্ষণামুক্তং পাপাদ্ধর্গো ভবিষ্যসি।।"

- অর্থাৎ, যেখানে গমন করলে, জীব ক্ষণকালমধ্যে পাপ থেকে মুক্ত হয় এবং সকল পাপ বিনষ্ট হয়, তোমায় সে' স্থানের মাহাত্ম্য বলব। এই বলে, বিষ্ণু বললেন:-

"আস্তি ভারতবর্ষস্য দক্ষিণস্যাং মহাপুরী,

তামালিপ্তং সমাখ্যাতং গূঢ়তীর্থ বরং বসেত।

তত্র স্নাত্বা চিরাদেব সম্যগেষ্যসি মত্পুরীং

জগাম তীর্থরাজস্য দর্শনার্থং মহাশয়।।"

- অর্থাৎ, ভারতবর্ষের দক্ষিণে তামালিপ্ত (তাম্রলিপ্ত) নামে মহাতীর্থ আছে, তাতে গূঢ়তীর্থ বাস করে। সেখানে স্নান করলে, লোকে বৈকুণ্ঠ্যে গমন করে। অতএব, আপনি তীর্থরাজের দর্শনের জন্য সেখানে যান।

বলার অপেক্ষা রাখেনা, একথা শুনে মহাদেব সেখানে গমন করেছিলেন। কথিত আছে, বর্গভীমা ও বিষ্ণুনারায়ণ মন্দিরের মধ্যবর্তী সরসীনীরে অবগাহনপূর্বক তাঁর হাতে শ্লিষ্ট থাকা দক্ষশির থেকে হাতকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

এবার আসা যাক, মহাভারতের যুগে। নরপতি তাম্ররাজ বা, মতান্তরে রাজা তাম্রধ্বজের কাছে এক ধীবর রমনী মৎস্য বা মাছ সরবরাহ করতেন। অনেক দূর রাস্তা অতিক্রম করতে হত বলে, তিনি পথিমধ্যে একটা কূণ্ডের জলে মাছগুলোকে একবার ডুবিয়ে নিতেন। যাতে, মাছগুলো মরে না যায়। ডুবিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই, এমনকি, ইতিমধ্যে মরে যাওয়া মাছগুোলও তৎক্ষণাৎ বেঁচে উঠত। কৌতুহলের বশবর্তী হয়ে রাজা একদিন অতদুর রাস্তা অতিক্রম করেও, জ্যান্ত মাছ সরবরাহের রহস্য জানতে চাইলে, ঘটনাটি তাঁর গোচরে আসে এবং তিনি গিয়ে দেবী-মা'কে দর্শন করেন। তারপর, দেবীমায়ের জন্য মন্দির নির্মানের বন্দোবস্ত করেন। বর্গভীমা মায়ের মন্দিরের উত্তর দিক সংলগ্ন হয়ে যে কুণ্ডটি আজও বর্তমান, সেটিকেই এই কথিত কুণ্ড বলে - প্রচলিত মতবাদ বললেও, আসলে সে কুণ্ডটি বর্তমানে গুপ্ত আছে। সেই কুণ্ডেই ধীবর রমনী তাঁর মৃত মৎস্যরাজির পুনরুজ্জীবন ঘটাতেন। দেবীর নিত্যভোগে একটি করে শোলমাছ নিবেদন এখানকার অবশ্যপালনীয় রীতি। আজও।।

বর্গভীমা মায়ের মন্দিরের বর্তমান যে রূপ, তা আসলে বিভিন্ন সময়ে হওয়া সংস্কার, বর্ধন, পরিমার্জন ইত্যাদির স্বাক্ষী হয়ে প্রতীয়মান। মূলমন্দিরটিতে বৌদ্ধরীতির স্থাপত্য-নিদর্শন পরিলক্ষিত হয়।

যখনই কেউ এই মন্দিরে আসেন, এক অনির্বচনীয় আনন্দঘন অনুভব তাঁর হয়। যেমন করে মায়ের স্নেহময়ী আঁচলের স্পর্শে দস্যি শিশুটিও স্থির হয়ে বসে, অনেকটা তেমনই। ইতিহাস-খ্যাত অথবা কুখ্যাত সেই "কালাপাহাড়" যখন তাঁর উড়িষ্যা অভিযানের পথে এক-একটা দেউল বা দেব মন্দির ধ্বংস করে এগিয়ে চলেছেন, রূপনারায়ণের তীরে তাম্রলিপ্ত বন্দরের কিছু দুরে তাঁর তাঁবু পড়েছে। তাঁবুতে শায়িত, বিশ্রামরত অবস্থায়, হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল উঁচু স্তূপের উপর প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরের চূড়ো। অকস্মাৎ, কি কারণে তিনি উঠে পড়ে, চলতে শুরু করলেন, মন্দির অভিমুখে। এসে, দেবীমায়ের সামনে দাড়ালেন। তাকিয়ে আছেন - স্থির নয়নে। পেছনে তাঁর বাহিনীর সৈন্যগণ অপেক্ষমান। এই বুঝি নির্দেশ আসে, গুঁড়িয়ে দেওয়ার। কিন্তু, কোথায় কি? সবাইকে অবাক করে দিয়ে, সেই মন্দির ধ্বংসের প্রচণ্ডমুর্তিরূপী কালাপাহাড় মন্দিরের সুশীতল বায়ুস্পর্শে ঘুমিয়ে পড়েছেন! আসলে কে এই মন্দির ধ্বংসকারী প্রচণ্ড কালাপাহাড়? কিংবদন্তী আর ইতিহাসের মিশেলে যে কাহিনী উঠে আসে, নেহাৎই বিস্ময়কর ও সেইসঙ্গে লোমহর্ষকও। দামোদরের তীরববর্তী স্থানের এক মায়ের আঁচলধরা ছেলে রাজু ; সেই রাজুু ওরফে রাজীবলোচনই একদিন সুলতান দুুহিতার প্রেমে পড়ে মুসলমান হওয়া প্রচণ্ড কালাপাহাড়।

স্থানীয় প্রখ্যাত লেখক মালীবুুড়ো তথা যুধিষ্ঠির জানা রচিত "বৃৃহত্তর তাম্রলিপ্তের ইতিহাস" অনুযায়ী, এই মন্দিরের উপাসকদের নিকট একটি তাম্রফলকে রচিত পঞ্জ বা দলিল আছে, যেটা পারসিক ভাষায় লেখা। দেবীকে দর্শন করে, প্রীত হয়ে, কালাপাহাড় কর্তৃক রচিত এই দলিল তথা বাদশাহী পঞ্জ তুলে ধরে তৎকালীন সময়কে। এই প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক হাণ্টার বলেন, - "নূতন রাজা কালুভূঞ্যা নূতন ঠাকুর প্রতিষ্ঠা করিয়া পূজারম্ভ করেন, ঐ ঠাকুর বর্গভীমা নামে বিরাজ করিতেছেন।" আবার, ধনপতি সদাগরের হাতে এই মন্দির ও মন্দিরের দেবী প্রতিষ্ঠার কাহিনী শোনায় - "A Statistical Account of Bengal" এর তৃতীয় খণ্ড।

সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত 'সাহিত্য' পত্রিকায় প্রকাশিত রাজেন্দ্রলাল গুপ্তের একটি প্রবন্ধে "বর্গভীমা মন্দির পূর্বে বৌদ্ধমন্দির ছিল" বলে, বর্ণিত হয়েছে। মূল মন্দিরের চারপাশ ঘিরে কতকগুলো ছোট ছোট গৃহ বা বিহার ছিল। সময়ের সাথেসাথে তার কিছু কিছু বিলীন হয়ে গেলেও, কিছু নিদর্শন আজও মেলে। একটু খুঁটিয়ে, বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে দেখলে, সেটা এখনও ধরা পড়ে। বুদ্ধগয়ায় যেরকম মন্দির গঠনের মধ্যে বৌদ্ধশৈলী দেখা যায়, তারই কিছুটা আভাস এই বর্গভীমা মন্দিরের নির্মাণশৈলীর মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। অনুমান করা হয়, বর্তমানে যে মূল-মন্দির, তাতে থাকতেন প্রধান আচার্য্য বা প্রধান পুরোহিত। কালাপাহাড় সম্ভবতঃ ১২৬০ এর কাছাকাছি সময়কার জালাল শাহের সময়ের।।

এছাড়াও, আরও অনেক রকমের কিংবদন্তী, প্রবাদ এই মন্দিরকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে।

অনেকে চণ্ডীতন্ত্রে বর্ণিত ভীমাদেবী ও বর্তমানের এই তমলুক-স্থিত মা বর্গভীমাকে এক বলেই মনে করেন। সতী'মায়ের খণ্ডীভূত ৫১টি দেহাংশ যেখানেই পড়েছে, এক একটি দেবী-মুর্তিতে পরিবর্তিত হয়েছে। আলাদা আলাদা নামে ও রূপে সেই দেবী-মুর্তি পরিচিতি লাভ করেছে। সব-ই আসলে শক্তি-পীঠস্থান হিসেবেই পরিচিত। তমলুকের এই বর্গভীমা মায়ের মন্দিরও তেমনিই - একটি পীঠস্থান। যদিও, অনেকে এই মুর্তিকে কালো পাথর খোদাই করে বানানো বলেই মনে করেন। তবে, সেইসঙ্গে তাঁরা এটাও স্বীকার করেন যে, এরকমের খোদাই করা মুর্তি সচরাচর দেখা যায়না। এখানে দেবীমায়ের পূজার্চনা ও স্তব-ধ্যান ইত্যাদি যোগিনী মন্ত্রানুসারে ও সেইসঙ্গে নীলতন্ত্রানুসারে হয়। কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গলেও এই দেবীমায়ের উল্লেখ আছে। কবিকঙ্কণ তাঁর কাব্যে লিখেছেন :

"গোকুলে গোমতীনামা তাম্রলিপ্তে বরগভীমা

উত্তরে বিদিত বিশ্বকায়া....."

তাঁর সময়ে, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে চারশ' বছর আগে কবিকঙ্কণ এই লেখা লিখে গিয়েছেন।।

এত দীর্ঘ সময়কে ছুঁয়ে, কালের প্রবাহে অটুট ও গর্বে সমুজ্জল হয়ে এই মন্দির আজও বর্তমান। এটা খুবই স্বাভাবিক যে, মন্দিরে বিভিন্ন সময়ের সংস্কারের ছাপ থাকবে এবং সেটা আছেও। শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন সময়ে হওয়া এইসব সংস্কার কার্য্যের ছাপ কিছুটা আলাদাভাবে খুঁজে পাওয়া যায়। তবে, এটা ঠিক যে, মূল মন্দিরের আদলকে প্রায় অক্ষুন্ন রেখেই এইসব সংস্কারের কাজ হয়েছে; মূল মন্দিরের চারপাশটাকে ঘিরে।

উচ্চতায় এই মন্দির প্রায় ৬০ ফুট। গোলাকার ছাদ বিশিষ্ট এই মন্দিরের ভেতরের দেওয়ালের পরিসর প্রায় ৯ ফুট। চারটি অংশে মন্দিরটি বিরাজিত :-

১) মূল মন্দির ২) জগমোহন ৩) যজ্ঞমন্দির ৪) নাটমন্দির।

তবে, মন্দিরটির সব অংশই একসাথে নির্মিত হয়নি। অষ্টাদশ শতাব্দীর শৈলীতে নির্মিত ২৭ টি দেব-দেবীর মুর্তি দ্বারা মন্দিরের বহির্দেওয়ালের অলঙ্করণ করা হয়েছে। এই মন্দিরে 'দেউল' রীতির "রেখ"চোখে পড়ে। নির্মাণশৈলী ও রূপ বিশ্লেষণ করলে, এখানে দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ শতাব্দীর কোনও এক সময়কার নির্মাণশৈলীর নিদর্শন পরিলক্ষিত হয়। বহুবার সংস্কার করার জন্য ও তৎসঙ্গে মূল দেবীমুর্তিকে মুখোশে আবৃত করার ফলে; এছাড়াও মন্দিরের দেওয়ালের বাইরের টেরাকোটার মুর্তিগুলি সিঁদুরের প্রলেপে ঢেকে যাওয়ার কারণে - মন্দিরের প্রাচীনত্বকে বোধগম্যতার নাগাল-বহির্ভূত করেছে।

দূর্গাপূজোর সময়ে মহাসমারোহে, ষোড়শোপাচারে দেবীমা'র পূজো হয়। মহাষ্টমীতে (সন্ধি-পূজোয়) বলি'ও হয়। মন্দিরে ওঠার সিঁড়ি দিয়ে উঠে,প্রথমেই প্রকাণ্ড হাঁড়িকাঠ; যেটা সিঁদুরের প্রলেপে ঢেকে, রক্তিমরূপে প্রকটভাবে বিরাজমান। এছাড়াও, নববর্ষে ও অন্যান্য বিশেষ তিথি পূজো উপলক্ষে এখানে বর্গভীমা মায়ের পূজো হয় মহা সমারোহে। প্রতিদিনকার প্রহরে প্রহরে ভোগ নিবেদন ও পূজো তো আছেই। এখনতো, উপনয়ন, বিবাহ, অন্নপ্রাশণ - প্রায় সব অনুষ্ঠান-ই এখানে ধুমধাম করে হয়।

বর্গভীমা মন্দির বর্তমানে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী পূর্বমেদিনীপুরের বুকে অন্যতম পীঠস্থান হিসেবে স্বমহিমায় বিরাজিত।

যেহেতু এই পীঠে এসে দেবাদিদেব শিবের ব্রহ্মহত্যার পাপের মোচন হয়েছিল, অর্থাৎ ; এখানে এসেই তাঁর হাতে লেগে থাকা দক্ষের মুণ্ড / কপাল আলাদা হয়েছিল, তাই এ'স্থান পুরাণমতে কপালমোচন নামেও পরিচিত। আজকের দিনের সব থেকে আবশ্যক যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি; তারও প্রকৃত পৃষ্ঠপোষণ করে এই পীঠ। বলা হয়, স্বয়ং বিশ্বকর্মা এই মন্দির নির্মাণ করেন। সেইজন্যই রূপনারায়ণ-তটবর্তী উচ্চ ভূখণ্ডে অবস্থিত এই মন্দিরের কারুকার্য্যে শিল্পনৈপুন্যতার ছাপ পরিলক্ষিত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, 'এই মন্দিরের স্থাপত্যেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রাথমিক ছাপটা চোখে পড়ে।

অনেকের মতে, বর্গভীমা মন্দিরটি আদতে এক বৌদ্ধ-স্থাপত্য। রাজা অশোকের তৈরী তাম্রলিপ্তের স্তূপের উপরে এই মন্দির নির্মিত হয়। মন্দিরের বাইরের ও ভিতরের গঠনশৈলী আলাদা। ভেতরের গঠনশৈলী একান্তই বৌদ্ধবিহার-সদৃশ।

মূল মন্দিরের সামনে রয়েছে যজ্ঞমন্দির। মূলমন্দির ও যজ্ঞমন্দির এই দুই মন্দিরকে যুক্ত করেছে জগমোহন নামক খিলান। যজ্ঞমন্দিরের সামনের দিকে, যেখানে নিচ থেকে সোপান-শ্রেণী উঠে এসেছে, সেখানটাতে বলিদানের জন্য ও দেবী-বন্দনার জন্য নাটমন্দির। তারও সামনে, তোরণ ও নহবৎ-খানা। এখানকার ভৈরব ভূতনাথ রয়েছেন - নিচে, যেখান থেকে সোপান শ্রেণী উঠে গেছে দেবী মন্দিরে।

শোনা যায়, শুধু কালাপাহড়ই নয়,মারাঠি বর্গীরাও দেবীমায়ের কাছে নত হয়েছিল। তাম্রলিপ্তে তারা অত্যাচারতো করতই না, বরং নানান অলঙ্কারে উপাচার সাজিয়ে পূজো দিতে আসত, বর্গভীমা মায়ের মন্দিরে।

অবস্থান :- তমলুকের মূল বাস-স্টপ তথা, মানিকতলা কিংবা হাসপাতাল-মোড় দুই দিক দিয়েই এই মন্দিরে যাওয়া যায়। (১) মানিকতলায় নেমে, ছোট যানবাহন সহযোগে পূর্বদিকে এগোলে,তমলুক কোর্ট পেরিয়ে ডানদিকে বেঁকে যাওয়া রাস্তা ধরে খানিক এগোলেই রাস্তার বামদিকে এই মন্দির। (২) তমলুক হাসপাতাল মোড়ে নেমে, পূর্বদিকে খানিক এগিয়ে, বামে ঘুরে আর একটু এগিয়ে ডানদিকে এই স্বনামধন্য মন্দির বিরাজমান, স্বমহিমায়।।

ভিডিওতে দেখুন:

***************************************************

#Bargabhimamandir #Bargabhimatemple #Tamluk #Tamralipta

Recent Posts